গাইবান্ধার চরে রোগীর বাহক বাঁশ আর দড়ি
মো. সাব্বির মামুন
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৯ পিএম
একটি সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ার, কিছুটা দড়ি আর একটি আস্ত বাঁশ। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো সাধারণ ঘরোয়া সরঞ্জাম মনে হলেও গাইবান্ধার দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের কাছে এটিই জীবনের শেষ ভরসা তাদের ‘অ্যাম্বুলেন্স’।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কয়েকটি ছবি বাংলাদেশের চরাঞ্চলের এক রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। ছবিতে দেখা যায়, প্রখর রোদে উত্তপ্ত বালুচর পাড়ি দিয়ে একদল মানুষ একটি বাঁশের ভার বইছে। সেই বাঁশে ঝুলছে একটি প্লাস্টিকের চেয়ার, আর তাতে দড়ি দিয়ে বেঁধে বসানো হয়েছে এক মুমূর্ষু রোগীকে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের জয়গান যখন সর্বত্র, তখন এই ছবিগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা আজও মরীচিকা।
ঘটনাটি গাইবান্ধা জেলার সদর উপজেলার ১৩ নং মোল্লার চর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকা ‘চর কাঁচির চর’-এর। ভৌগোলিকভাবে এটি কুড়িগ্রামের রাজিবপুর এবং জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এক বিচ্ছিন্ন জনপদ।
নদী ও বালুচরে ঘেরা এই অঞ্চলে নেই কোনো পাকা সড়ক। ফলে জরুরি প্রয়োজনে কোনো অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নেওয়ার একমাত্র উপায় হলো এই ‘বাঁশের ডুলি’। মাইলের পর মাইল তপ্ত বালু আর হাঁটু জল মাড়িয়ে যখন রোগীকে মূল ভূখণ্ডে আনা হয়, ততক্ষণে অনেকের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
চরাঞ্চলের এই মানুষের যন্ত্রণার কোনো ঋতুভেদ নেই। বর্ষাকালে যখন চারদিকে থৈ থৈ জল, তখন যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় নৌকা। কিন্তু উত্তাল নদীতে সব সময় নৌকা পাওয়া যায় না, আর পাওয়া গেলেও প্রবল স্রোতে পাড়ি দেওয়া থাকে জীবনঝুঁকি।
আবার শুষ্ক মৌসুমে যখন মাইলের পর মাইল ধুধু বালুচর জেগে ওঠে, তখন যাতায়াত আরও কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, "আমাদের এখানে কেউ অসুস্থ হলে এভাবেই নিতে হয়। অনেক সময় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রোগীর অবস্থা শেষ হয়ে যায়।"
এই দৃশ্য শুধু একটি ছবি নয়, এটি বাংলাদেশের অবহেলিত চরাঞ্চলের মানুষের প্রাত্যহিক সংগ্রামের এক প্রতিচ্ছবি। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পার হলেও এই জনপদগুলোতে এখনো পৌঁছায়নি ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা। একটি অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা এখানকার মানুষের কাছে অনেকটা স্বপ্নের মতো।
সচেতন মহলের মতে, এটি কেবল ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং এক ধরনের নীতিগত অবহেলারও ফল। কেন একটি জনগোষ্ঠীকে আজও মধ্যযুগীয় পদ্ধতিতে রোগী বহন করতে হবে, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
চরাঞ্চলের এই দীর্ঘদিনের অবহেলা দূর করতে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা:
- নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সেবা: নদীবেষ্টিত এলাকাগুলোতে সরকারি উদ্যোগে আধুনিক নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা।
- স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র: প্রতিটি দুর্গম চরে প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রসূতি সেবার জন্য ছোট ছোট স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র স্থাপন।
- যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা: বালুচরে চলাচলের উপযোগী বিশেষ যানবাহনের ব্যবস্থা করা।
প্রতিবার এমন ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে সাময়িক তোলপাড় সৃষ্টি হয়, কিন্তু দিনশেষে চরের মানুষের ভাগ্য বদলায় না। উন্নয়নের এই জোয়ারে কেন এই জনপদগুলো বারবার পিছিয়ে পড়ছে?
জীবন শহরে হোক কিংবা দুর্গম চরে—তার মূল্য সমান হওয়া উচিত। কিন্তু বাঁশের ডুলিতে ঝুলতে থাকা ওই রোগীটি যখন যন্ত্রণায় কাতরায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি সত্যিই একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে পেরেছি? উত্তরটি চরের ওই উত্তপ্ত বালুচরেই চাপা পড়ে থাকে।
তথ্যসূত্র: স্থানীয় সংবাদকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।