বিএনপি নেতাদের দাপটে অসহায় শিক্ষা কর্মকর্তা

কুড়িগ্রামে প্রাথমিকের বদলিতে নজিরবিহীন অনিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম

টাকার বিনিময়ে ও রাজনৈতিক প্রভাবে নীতিমালা লঙ্ঘন করে ১২ জনকে সুযোগ, জিম্মি শিক্ষা অফিস

কুড়িগ্রাম সদরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের আন্ত-উপজেলা বদলিতে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বদলি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে টাকার বিনিময়ে ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকাশ্য অনিয়মে শিক্ষক বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষক নেতৃবৃন্দ। অনুসন্ধানে এসব অনিয়মের প্রমাণও পাওয়া গেছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আবু বকর সিদ্দিক রাজনৈতিক ‘চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে’ নীতিমালা ভেঙে এই বদলির অভিযোগ স্বীকারও করেছেন। তবে ঠিক কারা তাঁকে চাপ প্রয়োগ করেছেন, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও অস্বীকার: উপজেলা শিক্ষা অফিসের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বেলগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বুধবার দুপুরে লোকজন নিয়ে শিক্ষা অফিসে যান। তিনি শিক্ষা অফিসারকে চাপ প্রয়োগ করে বদলি তালিকা পরিবর্তন করতে বাধ্য করেন।

তবে সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাহবুবুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি অফিসে গিয়ে ইউএনও এবং শিক্ষা অফিসারকে ধন্যবাদ দিয়ে এসেছি। আমি কোনো চাপ প্রয়োগ করিনি। যারা অভিযোগ তুলেছেন তারা সঠিক বলেননি।’

নীতিমালার চরম লঙ্ঘন ও জালিয়াতি: প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেলে বদলির আদেশ জারি করে ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ বিষয়ক কমিটি’। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার এই কমিটির সভাপতি এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সদস্য সচিব।

সদরের ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদে বদলির ইচ্ছা পোষণ করে আবেদন করেন ৪৩ জন শিক্ষক। ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা পর্যন্ত শুধু শূন্য পদের বিপরীতে এসব আবেদন আহ্বান করা হয়। কিন্তু বদলি সংক্রান্ত নথিপত্র এবং আদেশ যাচাই করে দেখা গেছে, ১২ জন শিক্ষককে বদলির আদেশ জারি করা হয়েছে, যার মধ্যে ৮ জনকেই নীতিমালা লঙ্ঘন করে সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের ৫টি নির্দেশনার ৪টিই এখানে লঙ্ঘন করা হয়েছে: ১. শূন্য পদের বিপরীতে বদলির নির্দেশনা থাকলেও, শূন্য পদ নেই এমন বিদ্যালয়েও শিক্ষক বদলি করা হয়েছে। ২. জ্যেষ্ঠতা (সিনিয়রিটি) চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। ৩. আবেদন করেননি এমন শিক্ষককেও বদলি দেখানো হয়েছে। ৪. বদলির নীতিমালায় বলা হয়েছে, যেসব বিদ্যালয়ে ৫ জন বা তার কম সংখ্যক শিক্ষক কর্মরত আছেন, সেখান থেকে শিক্ষক বদলি করা যাবে না। কিন্তু এই নির্দেশনাও মানা হয়নি।

অনিয়মের কিছু চাঞ্চল্যকর দৃষ্টান্ত: বদলির আদেশে দেখা গেছে, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে ৪ জনকে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তালিকায় ২ নম্বর ক্রমিকে থাকা শিক্ষক বাশিরুল মুমিন খন্দকারকে ২ জনের, ৩ নম্বর ক্রমিকে থাকা রোখসানা পারভীনকে ৩ জনের, ৪ নম্বর তালিকায় থাকা পাপড়ী রানীকে ৬ জনের এবং ৮ নম্বর ক্রমিকে থাকা ফরিদা বেগমকে সর্বোচ্চ ১০ জনের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলির সুযোগ দিয়েছে উপজেলা কমিটি।

তালিকায় ১০ নম্বর ক্রমিকে থাকা শিক্ষক আব্দুর রহিমকে সদরের পাঁচগাছি আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি দেখানো হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা অফিসের শূন্য পদের তালিকায় ওই স্কুলের নামই ছিল না এবং তিনি পছন্দের ক্রমানুসারে ওই স্কুলের নাম উল্লেখও করেননি।

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, ১২ নম্বর ক্রমিকের শিক্ষক মাহমুদা আক্তার বদলির আবেদনই করেননি। ৪৩ জন আবেদনকারীর তালিকায় তাঁর নাম নেই, অথচ তালিকা পরিবর্তন করে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করে তাঁকে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৫ নম্বর ক্রমিকে থাকা শিক্ষক মনিরা আক্তারের চাকরি ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হলেও তাঁকে ২০১০ সালে যোগদান দেখিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা কর্মকর্তা ও ইউএনও’র বক্তব্য: শিক্ষক নেতৃবৃন্দ বলছেন, লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা এই বদলি বাণিজ্য করেছেন। তাদের চাপে পড়ে প্রকৃত দাবিদার শিক্ষকদের বঞ্চিত করা হয়েছে।

বদলিতে অনিয়মের অভিযোগ অকপটে স্বীকার করেছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আবু বকর সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘আমি অসহায়। বাধ্য হয়েছি। যেগুলো অভিযোগ তুলেছেন, তা আমি অস্বীকার করছি না। আমাকে তালিকা দিয়ে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছে, আমি স্বাক্ষর করেছি। তবে কে বা কারা চাপ দিয়েছে তা আমি বলতে পারব না। আমাকে এমন প্রশ্ন করবেন না, যার উত্তর দিলে আমার চাকরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে এখানে যোগদান করেছি। শিক্ষকদের ভালো করে চিনি না। টাকা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি চেয়েছি নীতিমালা অনুযায়ী হোক। কিন্তু এখানকার সব খবর আপনারা জানেন। আর চাপ ও দুর্নাম নিতে পারছি না। আমি চাই এই বদলি আদেশ বাতিল হোক।’

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘তেমন রাজনৈতিক চাপ নয়, কিছু সুপারিশ ছিল। বড় ধরনের কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে বদলি আদেশ বাতিল করা হবে।’

প্রধান সম্পাদক: মো. নূরুল হক

যোগাযোগের ঠিকানা:

কুড়িগ্রাম অফিস: কলেজ রোড, চর রাজিবপুর, কুড়িগ্রাম।

ঢাকা অফিস: আজরত পাড়া, মহাখালী, ঢাকা ১২১২।

ইমেইল: mofossolsangbad@gmail.com

মোবাইল: 01626605495